ডায়াবেটিস শুধু রক্তে চিনি বাড়ায় না, এটি আমাদের শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতিও করতে পারে।
এই ক্ষতিকে বলা হয় “ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি” (Diabetic Neuropathy)।
এটি একটি ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা জটিলতা, যেখানে রোগী প্রথম দিকে তেমন কোনো ব্যথা টের পান না — কিন্তু পরে পা ও হাতের অনুভূতি কমে যায়, জ্বালা-পোড়া বা অসাড়তা দেখা দেয়।
ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির ধরন
ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি সাধারণত চার ধরনের হতে পারে —
- পারিফেরাল নিউরোপ্যাথি (Peripheral Neuropathy):
সবচেয়ে সাধারণ ধরন। সাধারণত পা ও পায়ের পাতা থেকে শুরু হয়। - অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি (Autonomic Neuropathy):
হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, হজম, ঘাম — এসব নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। - প্রক্সিমাল নিউরোপ্যাথি (Proximal Neuropathy):
উরু বা কোমরের অংশে ব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দেয়। - ফোকাল নিউরোপ্যাথি (Focal Neuropathy):
একটি নির্দিষ্ট স্নায়ু হঠাৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয় — যেমন চোখ বা মুখের স্নায়ু।
প্রধান উপসর্গ
- পায়ে জ্বালাপোড়া বা অসাড়তা
- পায়ের ত্বকে সূচ ফোটার মতো অনুভূতি
- হাত বা পা ঠান্ডা বা গরম অনুভব হওয়া
- ভারসাম্য হারানো বা হাঁটতে কষ্ট
- হজমে সমস্যা, অতিরিক্ত ঘাম, যৌন দুর্বলতা ইত্যাদি
অনেক সময় রোগীরা ভাবেন, “এটা হয়তো সাধারণ দুর্বলতা”, কিন্তু আসলে এটি স্নায়ু ক্ষতির শুরু হতে পারে।
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির চিকিৎসা সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়, তবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
চিকিৎসার মূল লক্ষ্য — রক্তে শর্করা স্বাভাবিক রাখা এবং স্নায়ু ক্ষতি কমানো।
১. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ
- নিয়মিত ইনসুলিন বা ওষুধ সেবন
- খাদ্যাভ্যাসে পরিমিত শর্করা
- নিয়মিত ব্যায়াম
২. ব্যথা নিয়ন্ত্রণের ওষুধ
- গ্যাবাপেন্টিন (Gabapentin) বা প্রেগাবালিন (Pregabalin)
- অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট জাতীয় ওষুধ (ডাক্তারের পরামর্শে)
৩. পায়ের যত্ন
- প্রতিদিন পা ধোয়া ও শুকিয়ে রাখা
- খালি পায়ে না হাঁটা
- পায়ের ক্ষত হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া
৪. জীবনধারার পরিবর্তন
- মানসিক চাপ কমানো
- ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার
- পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
যদি আপনি ডায়াবেটিস রোগী হন এবং নিচের উপসর্গগুলোর এক বা একাধিক থাকে, তবে অবিলম্বে নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নিন:
- পায়ে বা হাতে অসাড়তা
- হাঁটতে সমস্যা
- চোখ বা মুখের এক পাশে দুর্বলতা
- হঠাৎ মাথা ঘোরা বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি ধীরে ধীরে হলেও অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি জটিলতা।
তবে সচেতনতা, নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা, ও নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্পূর্ণ সম্ভব।
“ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ মানেই শুধু চিনি নয় — বরং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর সুরক্ষা।”
— ডা. আবু সালেহ মোঃ বদরুল হাসান



